ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একসময় বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সংসদে সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি রাজপথেও ধারাবাহিক কর্মসূচি দিচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিভিন্ন সমাবেশে সরকারকে জনগণের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দাবি মানা না হলে তারা এক দফার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে সরকারকে একদিকে সংসদ, অন্যদিকে রাজপথের চাপ সামলাতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের পাল্টা কর্মসূচিতে না গিয়ে সরকার পরিচালনা, জনদুর্ভোগ কমানো এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাব দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। তবে জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও জুলাই সনদের মতো ইস্যুতে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বিরোধীদের চাপ আরও বাড়তে পারে। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিরোধীদের কর্মসূচি নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারসংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে ১১-দলীয় জোট। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চ করেছে তারা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১০ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা লংমার্চ, ২৪ অক্টোবর ঢাকা-সিলেট ট্রেন লংমার্চ এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে জোটটি। নেতাদের দাবি, সংসদে আলোচনা ও প্রস্তাব দেওয়ার পরও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় তারা রাজপথে নেমেছেন।
সংসদেও সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে বিরোধীরা। স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধের জেরে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের সভাপতির দায়িত্ব না দেওয়ায় সংসদীয় গণতন্ত্রে তাদের ভূমিকা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারি দলের বক্তব্য, জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে কমিটি বণ্টনের বিষয়টি সম্পর্কিত এবং এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে।
বিরোধীদের ধারাবাহিক লংমার্চের পাল্টা কর্মসূচি না দিয়ে সরকার পরিচালনায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিরোধী দলের কর্মসূচি পালনের গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তবে জনদুর্ভোগ বা সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো দাবির যৌক্তিকতা থাকলে তা বিবেচনা করবে সরকার।
বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে কর্মসূচি দেওয়া বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সংকট সমাধানের উপায়, গ্যাস ও বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎস এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের বিকল্প পরিকল্পনাও দেওয়া উচিত। তার মতে, সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়াও বিরোধী দলের দায়িত্ব।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি মত হলো, রাজপথে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে উত্তেজনা বাড়ানোর চেয়ে সরকার পরিচালনায় সাফল্য দেখানো বেশি জরুরি। নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দিতে চায় দলটি।
তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র মত রয়েছে। কেউ কেউ বিরোধীদের মাঠের কর্মসূচির রাজনৈতিক জবাব দেওয়ার পক্ষে। অন্যদের মতে, সরকারের কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা গেলে আন্দোলনের প্রভাব কমে আসবে।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপি একটি জনবান্ধব দল। সরকার গঠন করার পর বিএনপি বারবার একটি বিধ্বস্ত অবস্থার দেশ পায়। এবারও এই অবস্থার ব্যতিক্রম নেই। এখন সরকারের সামনে যে সমস্যাগুলো এসেছে তার সবই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এমন অবস্থায় মাত্র ৭ মাসের মাথায় সরকারের পতন চাওয়া ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে জামায়াতের ইতিহাস ভালো নয়। জনগণের স্বার্থ নয়, নিজেদের স্বার্থ যেখানে- জামায়াত থাকে সেখানে।
সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো– বিরোধীদের কর্মসূচিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো– যেসব ইস্যু সামনে রেখে আন্দোলন হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকর সমাধান করা। বিশেষ করে জ্বালানি ও গ্যাসসংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারলে বিরোধীদের অভিযোগ মোকাবিলায় সরকারের অবস্থান জোরালো হবে।
অন্যদিকে এসব ইস্যুতে বিরোধীরা জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে সংসদ ও রাজপথ দুই জায়গাতেই সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের মধ্যে জাসদ ছাত্রলীগের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তারা যে আচরণগুলো করছে, অতীতে জাসদ ছাত্রলীগও একই ধরনের আচরণ করত। জামায়াতে ইসলামীর অনেক শীর্ষ নেতা একসময় জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’
এই মুহূর্তে তারা যেসব আচরণ করছে তাতে পাশের দেশ থেকে ফ্যাসিস্টরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। এখন বিরোধী দলের উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। তাই আপাতত বিএনপির কৌশল হলো–‘পাল্টা কর্মসূচি নয়, সরকার পরিচালনা, জনস্বস্তি নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের মোকাবিলা করা।’ এই কৌশলের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর।







