চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্যে বিপন্ন খাল, ঝুঁকিতে সাঙ্গু নদী
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়ন। এখানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) ‘দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র’ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত পানিমিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ (আঠালো ও আধা-কঠিন বর্জ্য পদার্থ) কোনো শোষণ ছাড়াই সরাসরি মইল্ল্যা খালে ফেলা হচ্ছে এবং তা পানিতে প্রবাহিত হয়ে মিশছে সাঙ্গু নদীতে। এরই মধ্যে খালের পানি দূষিত হয়ে জলজ প্রাণী ও বিভিন্ন উদ্ভিদ মারা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। শঙ্কা তৈরি হয়েছে নদীর পানি নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল স্লাজ ও তৈলাক্ত পানি তাদের নিজস্ব একটি ড্রেন দিয়ে সরাসরি মইল্ল্যা খালের ফেলা হচ্ছে। এতে খালের একটি অংশে পানির স্বাভাবিক রঙ ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে কালচে ধারণ করেছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
গত রবিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে তাদের একটি নিজস্ব ড্রেন রয়েছে। ওই ড্রেন দিয়ে পানির সঙ্গে পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল স্লাজ প্রবাহিত হয়ে সরাসরি মইল্ল্যা খালে মিশছে। ফলে খালের পানি তৈলাক্ত ও কালচে রঙ ধারণের পাশাপাশি পুরো খালজুড়ে কালচে আস্তরণ পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় খালের ভেতর ও পাড়ে জন্মানো উদ্ভিদ প্রায় মরে গেছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্ব পাশে মইল্ল্যা খালের পার্শ্ববর্তী একটি জমিতে কলার আবাদ করেছেন আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘আমি এই জমিতে অর্ধশতাধিক কলাগাছ রোপণ করেছিলাম। কিন্তু ভারী বর্ষণ ও বন্যার সময় খালের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাগানে প্রবেশ করেছিল। ওই কালো পানির কারণে অধিকাংশ কলাগাছ মারা গেছে। জমিটির কিছু অংশে এখনো কালো আস্তরণ লেগে আছে।’
কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘খালের পানির মাধ্যমে দূষিত স্লাজ সাঙ্গু নদীতে প্রবেশ অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ এই নদী সাতকানিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার অন্যতম অংশ। ফলে মইল্ল্যা খালের দূষণ শুধু খালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীর জলজ পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।’
গত শনিবার দুপুর ১টার দিকে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেন স্থানীয় মলেয়াবাদ, রসুলাবাদ ও নতুন চাগাচরসহ চার গ্রামের অসংখ্য মানুষ। তারা এ সময় ‘পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসুন, পৃথিবীকে ভালোবাসুন’ এবং ‘পরিবেশ দূষণকারী শুধু প্রকৃতির শত্রু নয়, সমগ্র মানবজাতির শত্রু’ স্লোগান দেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষক ও স্থানীয়রা জানান, কালিয়াইশ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে কৃষিপণ্য উৎপাদনে মইল্ল্যা খালের পানি সেচ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত ফার্নেস অয়েল স্লাজ খালের পানি দূষিত করেছে। ফলে জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার ফলে এসব স্লাজ আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া খালের বিভিন্ন অংশ তৈলাক্ত ও কালচে আকার ধারণ করেছে। এমনকি মইল্ল্যা খালে দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তারা।
মানববন্ধনের খবর পেয়ে সাতকানিয়া থানার একদল পুলিশ সেখানে উপস্থিত হন। পরে তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন আশ্বাস দিলে তারা সেখান থেকে চলে যান।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে মানববন্ধনের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের একটি টিম সেখানে পাঠানো হয়। পরে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া লোকজনদের প্রধান ফটক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ফার্নেস অয়েল স্লাজ বা তেলজাতীয় বর্জ্য পানিতে মিশে গেলে এর প্রভাব শুধু পানির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জলজপ্রাণী, উদ্ভিদ, মাটির গুণাগুণ এবং কৃষি উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেশ কয়েকবছর আগে পোড়া বর্জ্য তেল প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে মিশেছিল। তখন পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সাময়িক বন্ধ রাখারও নির্দেশ দিয়েছিল। আমরা চাই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হোক। তাই দূষণের উৎস শনাক্ত করে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ করা জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্লাজ সরাসরি খাল কিংবা নদীতে মিশতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।’
দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অতিবৃষ্টি এবং বন্যার ফলে হয়তো কিছু পানি মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ খালে মিশেছে। তবে আমরা শিগগিরই সেগুলো সরিয়ে নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। এই ফার্নেস অয়েল ব্যবহার পরবর্তী পানি মিশ্রিত স্লাজ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়। পরে সেখান থেকে পানি আলাদা করে স্লাজ সংরক্ষণ করা হয়। আমরা প্রতিবছর সেগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকি। তাই এগুলো ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি নজরে আসার পরপরই সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। বুধবার (আজ) আমাদের একজন পরিদর্শক ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দূষণের স্থানগুলো পরিদর্শন করবেন। এরপর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’








