চবি গবেষকদের মশা নিধনে নতুন উদ্ভাবন ‘মসকুবার’, দাবি শতভাগ কার্যকরী

প্রকাশ:

ডেঙ্গু বর্তমান বাংলাদেশের এক অন্যতম আতঙ্কের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে মশাবাহী রোগসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হলো ডেঙ্গু।

এডিস মশা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে এই ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়াসহ প্রাণঘাতী রোগ। আর এই রোগগুলো দমনে দরকার মশানিধন। মশানিধনে যেসব কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে সেগুলো কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বলা হচ্ছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে এসব কীটনাশক। এদিকে প্রচলিত মশার কীটনাশকের সঙ্গে গেলো বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি ভেষজ মশার ওষুধও। 

‘মসকুবার’ নামে এই ভেষজ ওষুধ দেশে প্রচলিত অন্য কীটনাশককে পেছনে ঠেলে শতভাগ কার্যকর বলে ল্যাব পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে মশা নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মশকনিধনের জন্য কার্যকর ওষুধ নিশ্চিতকরণে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটিকে ২০২১ সালে ৫টি কীটনাশকের নমুনা সরবরাহ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এরমধ্যে রয়েছে এডান্টিসাইড এবং লার্ভিসাইড। গবেষণা টিম ওই সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯৯টি স্থান পরিদর্শন করে। এরমধ্যে নগরীর ৫১টি স্থান এবং চবি ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরের আরও ৬টি স্থানসহ মোট ৫৭টি স্থান থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে। সংগ্রহকৃত কিছু সংখ্যক লার্ভা সংরক্ষণ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে লালন-পালনের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক মশায় রূপান্তর করা হয়। সরবরাহকৃত এডান্টিসাইড এবং একটি লার্ভিসাইড প্রাপ্তবয়স্ক মশা ও মশার লার্ভার প্রয়োগ করে কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।

৫টি নমুনা ওষুধের মধ্যে ভেষজ উপায়ে তৈরি মসকুবার মশার ওষুধ লার্ভিসাইড এবং এডাল্টিসাইড দুটিতেই শতভাগ কার্যকর। লার্ভিসাইড স্প্রে পরীক্ষায় বাকি তিনটির একটিতে ১৬ শতাংশ, একটিতে ৮৪ শতাংশ এবং অপরটিতে শূন্য শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। তবে এডাল্টিসাইড স্প্রে পরীক্ষায় হারবাল ওষুধ শতভাগ কার্যকর হয়। অপর ওষুধের মধ্যে একটি ৩৪ শতাংশ, দুটি ৮ শতাংশ, একটি ১২ শতাংশ ও একটি ৩ শতাংশ কার্যকর বলে পরীক্ষায় উঠে আসে। তবে ফগিং মেশিনে মশার ওষুধ স্প্রে করলে সেটি তেমন কার্যকর নয় বলেও এই গবেষণায় দেখা যায়। এ গবেষণায় ফগিং মেশিনে ১৯ শতাংশের উপর কোনটিই কাজ করেনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে মশা নিধন গবেষণায় সদস্য সচিব ছিলেন উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক ও আহ্বায়ক ছিলেন প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া।

সদস্য সচিব ড.মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন,২০২১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আমাদের উপাচার্যকে একটি চিঠি দিয়েছেন যে আমাদের এখানে যে ঔষুধগুলে ব্যবহার হয় এগুলো কতটুকু কার্যকর। কারণ বিভিন্ন জায়গা থেকে রিপোর্ট আসতেছে যে ঔষুধগুলো কার্যকরী হচ্ছে না। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে সদস্য সচিব ও প্রক্টর ড.রবিউল হাসান ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি ট্যাকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। ৫ সদস্যের অন্যান্যরা হলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মাইদুল. তাপসী ঘোষ রায়,প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.এইচ.এম.আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।

তিনি আরো বলেন, আমরা ১০০ টি জায়গা পরিদর্শন করেছি। এর মধ্যে ৩৩ টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা খুজে পেয়েছি। ৩৩ টি স্থানের মধ্যে ১৫ টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা বেশি ছিল। ১৫ টি স্থানের মধ্যে ছিল মাতারবাড়ি,আবাসিক কর্পোরেট এলাকা, চকবাজার ও হালিশহর এলাকা। মোটামুটি এই এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ছিল এডিস মশার লার্ভা।

আর ৫ টি ওষুধের মধ্যে ১ টি ওষুধের কার্যকারিতা ভালো ছিল।সেটা হলো হারবাল ওষুধ । আমরা রাসায়নিক কেমিক্যালগুলো সরাসরি প্রয়োগ না করে জৈবিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করেছি।কারণ রাসায়নিক কেমিক্যালগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। জলজ প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর। এখানে পিটিআই নামক একটা ট্যাকনোলজি আমরা ব্যবহার করেছি। উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করে ওষুধের কার্যকারিতা রক্তের করা।

এছাড়া চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে নিম,তুলসী,পুদিনা এ জাতীয় গাছ রোপন করলে মশার উৎপাতটা কমবে।আর কিছু মাছ আছে যেগুলো চাষ করে ড্রেনে ছেড়ে দিলে এডিস মশার লার্ভা খেয়ে থাকে। স্থানীয় ভাষায় এটাকে চোখ জানা মাছ বলা হয়।

তিনি আরো বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ৬ টি জায়গাতে আমরা পরিদর্শন করি এডিস মশার লার্ভা খুঁজে বের করার জন্য।কিন্তু কোন লার্ভা খুঁজে পায় নি।শুধু অ্যানোফেলিস মশার লার্ভা খুঁজে পেয়েছি।

ওষুধটির প্রয়োগের ব্যাপারে তিনি,কোম্পানি কতৃক সুপারিশকৃত যে,কেরোসিন তেলের সাথে ওষুধটির মিশ্রণ তৈরি করে স্প্রে করতে হবে। ফলে দেখা গেছে মশা নিধনে এটা শতভাগ কার্যকরী।

গবেষণা টিমের আহ্বায়ক প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, আমাদের কাছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে কিছু নমুনা আসে কার্যকারীতা পরীক্ষার জন্য। এগুলোকে আমরা A,B,C আকারে পাঠাই। এভাবে দেখা যায় আমরা পরীক্ষা করে দেখলাম B নমুনাটির ভালো কার্যকারীতা। তখন আমরা রিপোর্টে দেখিয়ছি B নমুনাটি কার্যকারীতা। 

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর