আজ প্রবারণা পূর্ণিমা। এদিনে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় এ উৎসব শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও আত্মপরিশীলতায় আত্মদীপ প্রজ্জ্বলনের আলোকময় দিন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ বর্ষাব্রত পালনের পর প্রতি পূর্ণিমা অমাবস্যায় অষ্টশীল গ্রহণ, উপবাসব্রত পালন করেন। বুদ্ধের ধর্মবাণী গুলো যথাযথভাবে ধারণ করে শীলে, ধ্যানে, বিদর্শন ভাবনায় আত্মনিমগ্ন হয়। বর্ষাব্রত সমাপনে আশ্বিনী পূর্ণিমার প্রথম দিবসে আসে প্রবারণার স্নিগ্ধ অমিয়ধারা, পূর্ণিমার পূর্ণতায় বোধিতে প্রবারিত হওয়ার দিন। দৈনন্দিন জীবনাচারের দোষ-ক্রটিকে বর্জন করে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ বিনয়বিধানে জীবনকে সঁপে দেওয়ার শুভক্ষণ।
এই সর্বজনীন উৎসব আকাশে উড়ানো হয় নানা রকম রঙিন ফানুস যেটাকে আকাশ প্রদীপও বলা হয়। নদীতে ভাসানো হয় হরেক রকমের প্যাগোডা আকৃতির জাহাজ। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নানা রকমের কীর্তন ,গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এর প্রেক্ষিতে রবিবার (৯ অক্টোবর) নগরের ডিসি হিল এলাকার নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দিরে করোনা কালীন দুই বছর পর আনন্দের সাথে পালন করছে এই উৎসব। স্বতস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহন করছে সকল ধর্মের লোকজন। প্রতি মিনিটে আকাশে উড়ছে ছোট বড় নানান আঁকারে ফানুস। এছাড়াও চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জ নবপতি বিহার, আগ্রাবাদ শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, দেবপাহাড় পূর্ণাচর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার এবং মোমিন রোডে সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন মন্দিরে ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বৌদ্ধ ধর্মের নিয়ম অনুসারে, আকাশে ফানুস ওড়ানো কেবল মাত্র উৎসব নয়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মূলত রাজ কুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ) দুঃখমুক্তি লাভের দৃঢ় সংকল্পে রাজ্য, রাজত্ব, ভোগ বিলাস ধনকুম্ভ সবকিছু ত্যাগ করে সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। এ তিথিতে তিনি সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে অনোমা নদীর তীরে পৌঁছলেন। সেখানে রাজ আবরণ সারথি ছন্দককে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করলেন। তিনি ভাবলেন, আমি এখন সন্ন্যাসী, রাজকীয় বাহারি চুল কিবা প্রয়োজন। তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে নিলেন। সিদ্বার্থ মনে মনে অধিষ্ঠান করলেন- যদি বুদ্ধ হওয়ার মত পারমী আমার মধ্যে থেকে থাকে তাহলে চুলের এই গোছা মাটিতে না পড়ে আকাশে স্থিত থাকুক। এই সংকল্প করে তিনি চুলের গোছা উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল একটা চুলও মাটিতে পড়ল না।
বৌদ্ধধর্ম মতে, স্বর্গের ইন্দ্ররাজা এ চুলগুলো হীরা, মণি-মাণিক্য খচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করে তাবতিংস নামক স্বর্গে এ চুলকে কেশ ধাতু হিসাবে স্থাপন করে একটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং এ চৈত্যের নাম রাখা হয় চুলামনি চৈত্য। স্বর্গের দেবতারা এখনও উক্ত চুলামনি চৈত্যের পূজা করে থাকেন। এমন বিশ্বাস থেকে মর্ত্যলোকের বুদ্ধভক্ত পূজারীরা স্বর্গের সেই চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ দিনে ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে আকাশে ফানুস ওড়ান।
এ সময় ধর্মীয় মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা প্রদীপ হিসেবে ফানুস উড়িয়ে উক্ত চুলামনি চৈত্যকে বন্দনা জানান। বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুর দ্বারা মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সাধু ধ্বনির সুরে সুরে ফানুস ওড়ানো হয়। যেই স্মৃতির উদ্দেশ্যে ফানুস ওড়ানো হয় সে হিসেবে আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনে ফানুস ওড়ানোর কথা। কিন্তু আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে বৃষ্টি এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় ফানুস ওড়ানোর জন্য আবহাওয়া অনুকূলে থাকে না। যে কারণে প্রবারণা বা আশ্বিনী পূর্ণিমার দিনে ফানুস ওড়ানো হয়।
নগরের ডিসি এলাকায় ফানুস উৎসব দেখতে আসা প্রশান্ত বড়ুয়া বলেন, সব মঠ, ধর্মীয় সংগঠনের নিজ নিজ কার্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সারা দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে প্রবারণা পূর্ণিমা। ভোরবেলা সমস্ত মঠে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন এবং পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পবিত্র শ্লোক উচ্চারণের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। এছাড়াও দুই বছর পর এইবার ডিসি এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছে। পূথিবীর সকল প্রানী সুখী হোক এই কামনা করি।








