আমি কিডনি রোগী। কিডনি ব্যথা করছে দেখে গতকাল ২০ হাজার টাকা কিস্তি তুলে এনেছি। বালিশের নিচে রেখেছিলাম। আগুনে টাকাসহ সব পুড়ে গেছে চোখের সামনেই। কোনো কিছু বের করতে পারিনি।
বুধবার (৪ অক্টোবর) ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ আমিন কলোনি এলাকার একটি বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া ঘরের জিনিসপত্র খুঁজতে খুঁজতে বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চাশোর্ধ আমেনা বেগম।
আমেনা বলেন, আমার ছেলে মেয়ে নেই। আমি ঢালাই কাজ করি। গতকাল চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এনে বালিশের নিচে রেখেছিলাম। সবাই ঘুমে ছিলাম। আগুন দেখে কিছুই মনে ছিল না। শুধু জানটা নিয়ে বের হয়েছি।
এমন বিলাপ শুধু আমেনা বেগমের একার না। বস্তিতে থাকা শতাধিক পরিবারের কয়েকশ মানুষও কাঁদছেন নিজের শেষ সম্বল হারিয়ে। কেউ আবার সব হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন।
একই বস্তির বাসিন্দা তৌহিদুল। প্রতিদিন ঢালাই কাজে ভোরে ঘর থেকে বের হলেও আজকে যাননি। সেই না যাওয়াই হয় তো তার ঘুমন্ত সন্তানকে কোলে তুলে রক্ষা করেছে।
বুকফাটা কাঁন্নায় তৌহিদ বলেন, আমার একমাত্র মেয়েটাসহ সবাই ঘুমে ছিলাম। আমার পাশে ছিল আগুন লাগা সেই মোজার গুদাম। দ্রুত আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বের হয়ে গেছি। আমি অন্য সময় প্রতিদিন খুব ভোরে কাজে চলে যাই। আজকে না যাওয়াতে আমার মেয়েটা বাঁচলো। আরেকটু হলে তো আগুনে পুড়ে মারা যেত।
এর আগে, বুধবার ভোর ৬টার দিকে নগরীর বায়েজিদ থানাধীন আমিন জুট মিল মসজিদের পাশের ‘পুড়া কলোনি’ নামের একটি বস্তিতে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে টানা আড়াই ঘণ্টা অভিযানে সকাল ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট অভিযান চালিয়ে এই আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়। এতে শতাধিক ঘর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কেউ হতাহত হননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই কলোনিতে থাকা বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর ও গার্মেন্টস শ্রমিক। পাশে থাকা কয়েয়কটি ছোট দোকান ও কাপড়ের গুদাম পুড়েছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই কলোনির বসতিঘর। কারও কোন কিছু বের করা সম্ভব হয়নি। এতে কলোনিটির আনুমানিক শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। তবে কলোনির ভেতরে থাকা রাবেয়া ডিজিটাল কেজি এন্ড হাই স্কুল নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগুন থেকে রক্ষা পেলেও পাশের ঘরে রাখা শিক্ষার্থীদের সব বই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
আগুন থামার পর নিজ নিজ ঘর থেকে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র সরাতে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্তরা। তখন অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা যায়।
এদিকে ঘটনাস্থলে, র্যাব, পুলিশসহ গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিত দেখা গেছে।
মামুনুর রশিদ নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, কীভাবে আগুন লাগছে জানি না। সকালে ফজরের নামায পড়ে শুয়েছি, আগুন আগুন চিৎকার শুনে উঠলাম। উঠে পুলিশকে পুলিশকে ফোন করছি। তারা ফায়ার সার্ভিসকে জানায়। সবাই ঘুম ছিল। চিৎকার শুনে সবাই বেরিয়ে কোন রকম জানটা বাচাইছে। এখানতে ৩০০ মত পরিবার রয়েছে। গুদাম আর দোকান আছে মাত্র কয়েকটি। আগুনটা মূতলত মোজার গুদাম থেকে শুরু হয়েছে। আমার ৭টা ঘর ভাড়া দেওয়া ছিল। প্রত্যেকটিতে ১ লাখ টাকা ধরে হিসেব করলে ৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আমার।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। এসব নিয়ে মামলা মোকদ্দমা চলছে। ৫ বছর আগেও এখানে আগুন লেগেছিল।
নুরুন্নবী সুমন আরেক ভুক্তভোগী বলেন, আমি এসে ভাড়াটিয়াদের থেকে শুনলাম ত্যানার (জুট কাপড়) গুদাম থেকে আগুন লাগছে। এখানে আমার ৪টা দোকান ও ৩২টা ভাড়া ঘর রয়েছে।
প্রতিবেশী ইমন বলেন, ঘুম থেকে উঠে শুনতেছি। এখানে গ্যাসে পাইপ থেকে নাকি মুদির দোকানে আগুন ধরছে। পরে সবাই মিলে বাকি দোকানের মালগুলো বের করেছে। তাদেরকে সহযোগিতা করেছি৷
ভুক্তভোগীরা জানান, কলোনীর সঙ্গে লাগোয়া কযেকটি কপড়ের গুদাম রয়েছে৷ সেখানে একটি মোজার গুদাম থেকে প্রথমে এই আগুন দেখা যায়। তবে কিসে থেকে আগুনের সূত্রপাত তা কেউ দেখেনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপসহকারী পরিবচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের বায়েজিদ ফায়ার সার্ভিসের টিম সকাল সাড়ে ৬টায় খবর পায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা এসে অভিযান শুরু করে এবং আমাদের আগ্রবাদ ফায়ার স্টেশনে সাহায্য চায়। এরপর আগ্রাবাদ, কালুরঘাটসহ তিনটব স্টেশন থেকে আমাদের ৬টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। সোয়া ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ হয়। ৯ টার দিকে আমরা আগুন পুরোপুরিভাবে নির্বাপণ করতে সক্ষম হয়েছে।
‘আমাদে ধারণা, হয়তো চুলার আগুন, না হয় মশার কয়েলের আগুন অথবা বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে আগুনটার সূত্রপাত ঘটতে পারে। প্রথমে একটি হাত মোজার গুদামে আগুনটা লেগেছে।’
এই ঘটনায় আনুমানিক ৪০টি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। পাশে থাকা মার্কেটকে আগুন থেকে রক্ষা করা গেছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না। এসময় কেউ হতাহত হয়নি বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।








