বাঁশখালীতে লবণ চাষিদের মুখে হাসির ঝিলিক

প্রকাশ:

লবণ উৎপাদন মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে লবণ। এ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে লবণ। মূলত ডলার সংকটের কারনে লবণ আমদানি বন্ধ থাকায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন চাষিরা। এদিকে এ মৌসুমে কম বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারনে অন্যান্য বছরের তুলনায় লবণ উৎপাদন বেড়েছে। এতে এ মৌসুমে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলের ১৯ হাজার হেক্টর জায়গায় ২ লক্ষ টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। বর্তমানে ধোলাই খরচসহ মণ প্রতি লবণ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকায়। এতে লবণের এ চড়া দামে বাঁশখালীর ২০ হাজার লবণ চাষিদের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটেছে।

 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার ছনুয়া, শেখেরখীল, পশ্চিম পুঁইছড়ি, পশ্চিম চাম্বলের ডেপুটিঘোনা, শীলকূপের মনকিচর, পশ্চিম সরল, গণ্ডামারা, বাহারছড়া, খানখানাবাদ উপকূলের ১৯ হাজার হেক্টর জায়গায়জুড়ে পুরোদমে চলছে লবণ উৎপাদন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারনে অল্প সময়ে উৎপাদন হচ্ছে অধিক লবণ। লবণের দাম চড়া হওয়ায় মুহুর্তে বিক্রি করে দিচ্ছে চাষিরা। লবণের দাম বেশি হওয়ায় চলতি মৌসুমে কানি প্রতি লবণের মাঠ লাগিত হয়েছে ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। ন্যায্যমূল্যে লবণ বিক্রি হওয়ার ফলে লবণ উৎপাদনে আগ্রহ বেড়েছে চাষিদের। ফলে এসব জায়গায় যেখানে লবণ চাষ হয়, সেখানে কোথাও অনাবাদি নেই বললেই চলে।

 

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা যায়, বাঁশখালীতে মোট ১৯ হাজার হেক্টর জায়গায় লবণ চাষ করা হয়েছে। তাতেই যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২ লক্ষ টনের বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। এদিকে উপজেলার সরল ইউনিয়নে বিসিক আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। সেখানে নিজস্ব তদারকির মাধ্যমে লবণ উৎপাদন ও রপ্তানি করে থাকেন লবণ চাষিরা। ইতোমধ্যে বাঁশখালীর উপকূলে উন্নত পদ্ধতিতে সাদা দানাদার, পলিথিন ব্যবহার ও পরিপক্ব লবণ উৎপাদনে চাষিদেরকে উদ্যাক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করছে বিসিক। চাষিদের প্রশিক্ষণ ছাড়াও, ঋণ ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণসহ সার্বিক সহায়তাও দিচ্ছে তারা।

 

লবণ চাষিরা জানান, এ বছর মণ প্রতি লবণ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৫০ টাকা, অথচ মন প্রতি লবণের বাজারমূল্য এখন ৫০০ থেকে ৫৫০টাকা। তাই তারা লাভবান হচ্ছেন। তবে গত বছর প্রতি মণ লবণের বাজারমূল্য ছিল ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা। এতে কিছুটা হলেও গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছেন তারা। বর্তমানে ডলার সংকটের কারনে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় চাষিরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

 

সরলের লবণ চাষি মাহবুব আলম বলেন, ‘আমরা ছনুয়া থেকে এসে দুই বন্ধু মিলে এখানে ৮ কানি জমিতে লবণ চাষ করেছি। মৌসুমের শুরুতে এলাকার মহাজন থেকে ঋণ নিয়ে লবণ উৎপাদনের কাজ শুরু করেছিলাম। ৮ কানি জমিতে ৪ জন শ্রমিকের বেতনসহ ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে খরচ বাদ দিয়ে ৪ লক্ষ টাকা লাভ হয়েছে। আমরা চাই লবণের ন্যায্যমূল্য আগামী মৌসুমেও অব্যাহত থাকুক।’

 

এদিকে জমি মালিকদের উপর ক্ষোভ জানিয়ে গণ্ডামারার লবণ চাষী জসিম উদ্দীন বলেন, ‘জমি মালিক ও পাইকারদের কাছে জিম্মি লবণ চাষিরা। বছর বছর লবণ চাষের জমির ইজারা মূল্য বাড়াচ্ছে জমি মালিক। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অন্যান্য খরচও। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা লবণের ন্যায্যমূল্য দিচ্ছেনা আমাদের। ফলে লবণের কিছুটা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার পরেও প্রান্তিক চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

 

বাহারছড়ার লবণ চাষী মোশাররফ বলেন, ‘গেল কয়েক বছর ধরে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির অজুহাতে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত আমরা। তাই অনেকে এ মৌসুমে লবণ চাষে আসেনি। যারা এসেছে, তারা ন্যায্য মূল্য পেলেও জমি ইজারা ও অন্যান্য খরচের কারনে তেমন লাভবান হবে না।’

 

বাঁশখালী উপজেলা লবণ ব্যবসায়ী মো. তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানে মোকামে লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৫৩০ থেকে ৫৭০ টাকায়। উৎপাদন খরচের চেয়ে তুলনামূলক বেশ দাম পাচ্ছে চাষিরা। এরকম লবণ আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকলে লবণ চাষিরা ভাল দাম পাব। যার ফলে বাড়বে চাষির সংখ্যা। বাড়বে লবণ উৎপাদনও। তবে অন্যান্য বছর চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে সরাসরি বাজারজাত করায় লবণের তেমন মূল্য ছিল না। এ নিয়ে আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো কাজ হয়নি। আমদানি ব্যবসায়ীরা চান দেশীয় লবণ শিল্প চিরতরে বন্ধ হয়ে যাক। তাদের কারনে আমাদের মত ক্ষূদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ি।’

 

বিসিক বাঁশখালী উপজেলা কেন্দ্র প্রধান আনসারুল হক বলেন, ‘বাঁশখালীতে ১৯ হাজার হেক্টর জায়গায় লবণ চাষ করা হয়েছে। তাতেই যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২ লক্ষ টনের বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া চলতি মৌসুমে দেশে লবণ উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করতে একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বিদেশ থেকে যাতে লবণ আমদানি করতে না হয় সে লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে দেশজুড়ে ৮০ হাজার একর জমিতে ২৬ লক্ষ মেট্রিক টন পরিশোধিত লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।’

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর